বাংলাদেশের প্রতিদিনের রান্নায় পেঁয়াজ এমন একটি উপাদান, যেটি ছাড়া অনেক পরিচিত খাবারের স্বাদই অসম্পূর্ণ মনে হয়। ভর্তা, ভাজি, তরকারি, মাছ-মাংসের রান্না থেকে শুরু করে সালাদ—প্রায় সব ধরনের খাবারেই পেঁয়াজের ব্যবহার রয়েছে। তাই পেঁয়াজের দাম বাড়লে বা কমলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাজার খরচে পড়ে।
অনেকেই অনলাইনে “আজকের ১ কেজি পেঁয়াজের দাম কত”, “আজ পেঁয়াজের দাম কত”, “দেশি পেঁয়াজের দাম কত” কিংবা “পেঁয়াজের কেজি কত টাকা” এ ধরনের তথ্য খুঁজে থাকেন। তবে পেঁয়াজের দাম কোনো স্থায়ী সংখ্যা নয়। উৎপাদন, সরবরাহ, মৌসুম, আমদানি, পরিবহন খরচ, বাজারের চাহিদা এবং পেঁয়াজের মানের ওপর ভিত্তি করে একই দিনে বিভিন্ন বাজারেও দামের পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
আপনার দেওয়া বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, দেশি পেঁয়াজের ১ কেজির দাম ১০০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে ধরা হয়েছে। তবে এটি নির্দিষ্ট সময় ও বাজারের একটি মূল্যপরিসর; স্থানীয় বাজারে কেনার আগে সর্বশেষ খুচরা দর যাচাই করা ভালো।
পেঁয়াজের বর্তমান মূল্য তালিকা
নিচের হিসাবটি ১ কেজি দেশি পেঁয়াজের ১০০–১৪০ টাকা মূল্যপরিসরকে ভিত্তি করে করা হয়েছে। পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে একই অনুপাতে হিসাব করা হয়েছে। বাস্তবে পাইকারি বাজারে বড় পরিমাণে কিনলে কেজিপ্রতি দাম আলাদা হতে পারে।
| পরিমাণ | দেশি পেঁয়াজের আনুমানিক মূল্য |
|---|---|
| ১ কেজি | ১০০–১৪০ টাকা |
| ১০ কেজি | ১,০০০–১,৪০০ টাকা |
| ২৫ কেজি | ২,৫০০–৩,৫০০ টাকা |
| ৫০ কেজি | ৫,০০০–৭,০০০ টাকা |
| ১০০ কেজি | ১০,০০০–১৪,০০০ টাকা |
| ৫০০ কেজি | ৫০,০০০–৭০,০০০ টাকা |
| ১,০০০ কেজি | ১,০০,০০০–১,৪০,০০০ টাকা |
উল্লেখিত হিসাব মূলত সরল গাণিতিক হিসাব। পরিবহন, আড়তদারি, বাজারের কমিশন, বাছাই, নষ্ট হওয়ার পরিমাণ এবং পাইকারি ক্রয়ের শর্ত অনুযায়ী প্রকৃত মোট খরচ ভিন্ন হতে পারে।

দেশি পেঁয়াজের দাম কত?
বাংলাদেশে দেশি পেঁয়াজের চাহিদা সবসময়ই বেশ ভালো। এর অন্যতম কারণ হলো রান্নায় এর স্বাদ, ঝাঁঝ এবং গন্ধ অনেকের কাছে বেশি পছন্দনীয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় মৌসুমে দেশের বিভিন্ন বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়তে পারে।
আপনার দেওয়া মূল্যতথ্য অনুযায়ী, ১ কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ১০০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে কোনো নির্দিষ্ট বাজারে একই দিনে এর চেয়ে কম বা বেশি দাম থাকতে পারে।
পেঁয়াজ কেনার সময় শুধু কেজিপ্রতি দাম দেখলেই হবে না। পেঁয়াজের আকার, শুকনো কি না, পচা বা নরম অংশ আছে কি না, সংরক্ষণের অবস্থা এবং জাতের ওপরও দাম নির্ভর করতে পারে।
আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম কেন আলাদা?
বাংলাদেশে স্থানীয় উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় আমদানিকৃত পেঁয়াজও বাজারের সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমদানিকৃত পেঁয়াজের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন, সীমান্ত ও বন্দরসংক্রান্ত খরচ, শুল্ক বা অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যয় এবং বাজার পরিস্থিতি দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই দেশি ও আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম সবসময় এক থাকবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
কখনো দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকলে এর দাম কমে যেতে পারে। আবার উৎপাদন কম হলে বা বাজারে সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে আমদানির পরিমাণ বাড়লে বাজারে মোট সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কিছু ক্ষেত্রে দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
পেঁয়াজের দাম প্রতিদিন কেন পরিবর্তন হয়?
পেঁয়াজের বাজারদর স্থির না থাকার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
উৎপাদন ও মৌসুম
পেঁয়াজ একটি কৃষিপণ্য হওয়ায় মৌসুমের সঙ্গে এর সরবরাহের সম্পর্ক রয়েছে। উৎপাদনের সময় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়লে দাম তুলনামূলক কমতে পারে। বিপরীতে অফ-সিজনে সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বাজারে চাহিদা
কোনো সময়ে পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহ একই থাকলে দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে উৎসব, রমজান বা বিশেষ মৌসুমে কিছু পণ্যের বাজারচাহিদায় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
পরিবহন খরচ
কৃষকের উৎপাদনস্থল থেকে পেঁয়াজ ঢাকার মতো বড় শহর বা অন্য অঞ্চলের বাজারে পৌঁছাতে পরিবহন প্রয়োজন। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত খুচরা দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
সংরক্ষণ ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি
পেঁয়াজ দীর্ঘ সময় ভালো রাখতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত আর্দ্রতা, তাপমাত্রা বা দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে পেঁয়াজ নষ্ট হতে পারে। এতে কার্যকর সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারদরে প্রভাব পড়তে পারে।
আমদানি পরিস্থিতি
দেশীয় উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে ঘাটতি তৈরি হলে আমদানি বাজারের সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার আমদানিতে কোনো পরিবর্তন হলে বাজারদরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

খুচরা ও পাইকারি পেঁয়াজের দামের পার্থক্য
একজন সাধারণ ক্রেতা সাধারণত খুচরা বাজার থেকে ১ বা ২ কেজি পেঁয়াজ কেনেন। অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ী অনেক বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ কেনাবেচা করেন। ফলে দুই পর্যায়ের দাম এক নাও হতে পারে।
খুচরা দামের মধ্যে সাধারণত পরিবহন, দোকানের খরচ, শ্রম, বাছাই এবং ব্যবসায়িক মার্জিনের মতো বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হতে পারে। তাই কোনো অনলাইন উৎসে দেখা পাইকারি দরকে সরাসরি স্থানীয় দোকানের খুচরা দর হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
পেঁয়াজের দাম কমানোর জন্য কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ?
পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত উৎপাদন, পর্যাপ্ত সরবরাহ, ভালো সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে ফসল তোলার পর নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমানো সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে বাজারে অস্বাভাবিক সরবরাহ সংকট তৈরি হলে দ্রুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশি উৎপাদন ও প্রয়োজনীয় আমদানির মধ্যে ভারসাম্য থাকলে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
পেঁয়াজের পুষ্টিগুণ ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা
পেঁয়াজ শুধু রান্নার স্বাদ বাড়ানোর উপাদান নয়; এতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। পেঁয়াজে ভিটামিন C, কিছু বি-ভিটামিন, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ পাওয়া যায়। তবে পেঁয়াজ কোনো রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয় এবং শুধু পেঁয়াজ খেলে নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ হবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগের উৎস
পেঁয়াজে কোয়ারসেটিনসহ বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। এসব যৌগ শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে।
হজমে সহায়ক হতে পারে
পেঁয়াজে খাদ্যতালিকাগত ফাইবার এবং কিছু প্রিবায়োটিক উপাদান রয়েছে, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে যাদের পেঁয়াজ খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয়, তাদের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত।
হৃদ্স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে
পেঁয়াজকে সবজি ও উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের অংশ হিসেবে নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক সুষম খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
ভিটামিন ও খনিজ সরবরাহে ভূমিকা
পেঁয়াজে অল্প পরিমাণে বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির সঙ্গে পেঁয়াজ যুক্ত করলে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা তৈরি করা সহজ হয়।
কাঁচা পেঁয়াজ নাকি রান্না করা পেঁয়াজ—কোনটি ভালো?
দুইভাবেই পেঁয়াজ খাওয়া যায়। কাঁচা পেঁয়াজে এর কিছু তাপ-সংবেদনশীল উপাদান তুলনামূলকভাবে অক্ষত থাকতে পারে। আবার রান্না করলে পেঁয়াজের স্বাদ ও গন্ধ বদলে যায় এবং বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করা সহজ হয়।
তবে পেঁয়াজ কীভাবে খাবেন, সেটি ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে। কারও যদি কাঁচা পেঁয়াজে অস্বস্তি হয়, তাহলে রান্না করা পেঁয়াজ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
ভালো পেঁয়াজ চেনার সহজ উপায়
বাজার থেকে পেঁয়াজ কেনার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল করলে ভালো মানের পেঁয়াজ বেছে নেওয়া সহজ হয়।
শক্ত ও শুকনো পেঁয়াজ বেছে নিন
ভালো পেঁয়াজ সাধারণত শক্ত এবং তুলনামূলকভাবে শুকনো থাকে। অতিরিক্ত নরম পেঁয়াজে ভেতরে পচন শুরু হয়ে থাকতে পারে।
পচা বা ভেজা অংশ দেখুন
পেঁয়াজের গায়ে কালো দাগ, অতিরিক্ত ভেজাভাব বা দুর্গন্ধ থাকলে সেটি এড়িয়ে চলা ভালো।
অতিরিক্ত অঙ্কুর বের হওয়া পেঁয়াজ
অনেক বেশি অঙ্কুর বের হওয়া পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষিত হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। এমন পেঁয়াজ দ্রুত ব্যবহার করা ভালো।

বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম জানতে কীভাবে সবচেয়ে ভালো তথ্য পাবেন?
“আজকের পেঁয়াজের দাম” জানতে শুধু একটি ওয়েবসাইটের পুরোনো মূল্যতালিকার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ বাজারদর দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
আপনি যে বাজার থেকে পেঁয়াজ কিনবেন, সেই বাজারের সর্বশেষ খুচরা দর যাচাই করা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের একাধিক দোকানের দাম তুলনা করলে প্রকৃত বাজারপরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
বিশেষ করে অনলাইনে প্রকাশিত কোনো মূল্যতালিকার তারিখ, বাজারের নাম এবং খুচরা না পাইকারি দর—এই তিনটি বিষয় অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত।
ভারতেও পেঁয়াজের দাম কি একই?
না। বাংলাদেশ ও ভারতের পেঁয়াজের বাজারদর একই হওয়া স্বাভাবিক নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য, শহর ও বাজারে উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন এবং স্থানীয় চাহিদার কারণে পেঁয়াজের দাম আলাদা হতে পারে।
তাই ভারতের “আজকের পেঁয়াজের দাম” বলতে নির্দিষ্ট রাজ্য বা বাজার উল্লেখ করা প্রয়োজন। একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা বা অন্য কোনো এলাকার দাম এক নাও হতে পারে।
শেষ কথা
আজকের ১ কেজি পেঁয়াজের দাম জানতে গেলে শুধু একটি সংখ্যা জানলেই পুরো বাজারচিত্র বোঝা যায় না। দেশি না আমদানিকৃত, খুচরা না পাইকারি, কোন এলাকার বাজার, পেঁয়াজের মান এবং কোন তারিখের দর এসব বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি।
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশি পেঁয়াজের ১ কেজির মূল্যপরিসর ১০০ থেকে ১৪০ টাকা। তবে এটিকে বাংলাদেশের প্রতিটি বাজারের লাইভ দর হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। বাজারে যাওয়ার আগে স্থানীয় বিক্রেতা বা নির্ভরযোগ্য সর্বশেষ বাজারতথ্য থেকে দাম যাচাই করলে ভুল তথ্যের সম্ভাবনা কমে।
পেঁয়াজের দাম যেমন সাধারণ মানুষের বাজার খরচে প্রভাব ফেলে, তেমনি কৃষক, পাইকার, আমদানিকারক এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপরও এর পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। তাই পেঁয়াজের দাম বুঝতে হলে উৎপাদন, মৌসুম, সরবরাহ, চাহিদা, সংরক্ষণ, আমদানি এবং পরিবহন সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।